6:50 am, Monday, 2 November 2026

পাহাড়, মেঘ ও ঝর্ণার ডাক

  • Reporter Name
  • Update Time : 04:59:39 pm, Thursday, 14 August 2025
  • 267 Time View

তানজিম আহমেদ রায়হানঃ আগস্ট ২০২৫  বৃহস্পতিবার দুপুরে আমি, আম্মু ও আব্বু চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম।

প্রথমে সিএনজি করে নানুবাড়ি, শাহজাহানপুর। বড় খালার বাসায় দুপুরের খাবার খেলাম—ঝালমরিচের গন্ধে গরম ভাত আর দেশি মাছের স্বাদ যেন ভ্রমণের প্রথম আনন্দ।

এরপর রাজারবাগ থেকে গ্রিন লাইন দোতলা বাসে চট্টগ্রামের পথে রওনা হলাম। জানালার পাশে বসে দেখছিলাম—শহর মিলিয়ে যাচ্ছে, জায়গা নিচ্ছে নদী, ক্ষেত আর দিগন্তের টিলা। রাত ১১টার দিকে চট্টগ্রাম পৌঁছালাম।

সিএনজি নিয়ে সার্সন রোডের পাহাড়ের উপরে **চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ ডাক বাংলো**তে পৌঁছালাম। পাহাড়ি পথ বৃষ্টিতে ভিজে চকচক করছিল। কেয়ারটেকার দেলোয়ার এলেন কিছুক্ষণ পর, আরেকজন কেয়ারটেকার যিশু হোটেল থেকে আনা খাবার টেবিলে সাজিয়ে দিল। ডাইনিং হলের উষ্ণ আলো, বাইরের ঝিরঝির বৃষ্টি—ঘুমের আমন্ত্রণ অগ্রাহ্য করা গেল না।

৮ আগস্ট ২০২৫ – শুক্রবার সকালে আম্মু হাজী মহসিন কলেজে, আর আব্বু নাসিরাবাদ মহিলা কলেজে পরীক্ষার দায়িত্বে গেলেন। আমি আম্মুর সাথে কলেজে গেলাম—টিলার উপর থাকা এই কলেজ থেকে শহরের অর্ধেকটা দেখা যায়।

দুপুরে পরীক্ষা শেষে আমরা গনি বেকারি রোডের মেজবানি হোটেলে গেলাম। গরুর মাংস, মেজবানি ডাল আর লইট্টা শুঁটকির ঝাঁঝ—পাহাড়ি ভ্রমণের প্রস্তুতি যেন প্লেটে সাজানো।

বিকেলে গাড়ি ভাড়া করে বান্দরবানের পথে রওনা দিলাম। তিন ঘণ্টার পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ, বৃষ্টিতে ভেজা বাতাস, মাঝে মাঝে দূরের ঝর্ণার শব্দ—সব মিলিয়ে যাত্রাটা হয়ে উঠল এক আলাদা অভিজ্ঞতা। সন্ধ্যায় পৌঁছালাম উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের গেস্ট হাউসে,সাদামাটা কিন্তু আরামদায়ক, আর বারান্দা থেকে রাতের বান্দরবান শহরের ঝিকিমিকি আলো দেখা যাচ্ছিল।

৯আগস্ট ২০২৫ – শনিবার সকালবেলা নাস্তা সেরে শুরু হলো আমাদের পাহাড়ি অভিযান। প্রথমে গেলাম নীলগিরি পাহাড়ের গায়ে আঁকাবাঁকা রাস্তা, আর উপরে উঠতে উঠতে চারপাশের মেঘ যেন হাতছানি দিচ্ছে। চূড়ায় দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, আমরা আকাশের মধ্যে আছি।

তারপর গেলাম থানচি বাজার এখান থেকে সাঙ্গু নদী পাড়ি দিয়ে নৌকায় চিংড়ি ঝর্ণার পথে। পাহাড়ি বাতাসে ভেজা চুল, বড় বড় প্রজাপতির মেলা, আর গাছের ডালে মুনিয়া পাখির বাসা বানানোর দৃশ্য সব মিলিয়ে যেন প্রাকৃতিক এক সিনেমা।

চিংড়ি ঝর্ণায় পৌঁছে ঠান্ডা পানিতে গোসল করলাম। সাদা ফেনা ছড়িয়ে পড়ছিল চারপাশে, আর ঠান্ডা পানি গায়ে লাগতেই গা শিরশির করে উঠল। সন্ধ্যায় ফিরে এলাম এবং রাত কাটালাম নীলাচল রিসোর্টে এখান থেকে বান্দরবান শহরের রাতের দৃশ্য স্বপ্নের মতো লাগে।

১০ আগস্ট ২০২৫ – রবিবার সারাদিন নীলাচল রিসোর্টে পাহাড়ি সৌন্দর্যের মধ্যে কাটল। সকালে বারান্দা থেকে দেখি মেঘে ঢাকা বান্দরবান—নিচে শহর, উপরে ঝিরঝির বৃষ্টি। রিসোর্টের উঠোনে ছিল কাঠের দোলনা, পাটের রশি দিয়ে বাঁধা—আমার প্রিয় জায়গা হয়ে গেল।

দুপুরে তঙ রিসোর্টে খেতে গেলাম—বাশখোড়ল, ব্যাম্বু চিকেন, পেঁপে, আনারস—সবকিছুই ছিল পাহাড়ি স্বাদের ভরপুর। রাতে বাইরে নিশাচরের ডাক আর ভেতরে উষ্ণ আলোয় ডিনার—যেন পাহাড়ি রূপকথা।

১১ আগস্ট ২০২৫ – সোমবার সকালে রওনা দিলাম মেঘলা স্পট দেখতে। ঝুলন্ত ব্রিজে পা রাখতেই নিচের জলাশয় আর চারপাশের পাহাড় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে। সময়ের অভাবে ক্যাবল কারে চড়া হলো না, কিন্তু ব্রিজে দাঁড়িয়ে বাতাসে দুলতে থাকা মুহূর্তটা মনে গেঁথে গেল।

এরপর গেলাম রূপালি ঝর্ণা ঝকঝকে পানির ধারা, ঠান্ডা ফোয়ারায় গোসল, আর পাহাড়ি বাতাসের গন্ধ।

দুপুরে পাহাড়ি ফল খাওয়া হলো—মিষ্টি আনারস আর পাকা পেঁপে। বিকেলে শেষবারের মতো নীলাচল রিসোর্টের বারান্দা থেকে বান্দরবানের সূর্যাস্ত দেখলাম।

রাত ৯টায় বান্দরবান থেকে চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকার পথে রওনা দিলাম।

১২ আগস্ট ২০২৫ – মঙ্গলবার ভোর ৭টায় ঢাকায় পৌঁছালাম। জানালার বাইরের শহরের ভিড় দেখে মনে হচ্ছিল—আমি যেন এখনও পাহাড়ের মেঘে আছি, নিশাচরের ডাক শুনছি, আর কাঠের দোলনায় দুলছি।

এই ভ্রমণ আমার কাছে শুধু জায়গা দেখা নয়, বরং পাহাড়, মেঘ, বৃষ্টি আর মানুষের গল্পের সাথে এক গভীর বন্ধন তৈরি করে দিয়েছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে উত্তাল গোয়াইনঘাট : বিএনপি নেতা স্টেলিং তারিয়াংয়ের সমর্থনে তৃণমূলের মানববন্ধনের ঘোষণা

পাহাড়, মেঘ ও ঝর্ণার ডাক

Update Time : 04:59:39 pm, Thursday, 14 August 2025

তানজিম আহমেদ রায়হানঃ আগস্ট ২০২৫  বৃহস্পতিবার দুপুরে আমি, আম্মু ও আব্বু চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম।

প্রথমে সিএনজি করে নানুবাড়ি, শাহজাহানপুর। বড় খালার বাসায় দুপুরের খাবার খেলাম—ঝালমরিচের গন্ধে গরম ভাত আর দেশি মাছের স্বাদ যেন ভ্রমণের প্রথম আনন্দ।

এরপর রাজারবাগ থেকে গ্রিন লাইন দোতলা বাসে চট্টগ্রামের পথে রওনা হলাম। জানালার পাশে বসে দেখছিলাম—শহর মিলিয়ে যাচ্ছে, জায়গা নিচ্ছে নদী, ক্ষেত আর দিগন্তের টিলা। রাত ১১টার দিকে চট্টগ্রাম পৌঁছালাম।

সিএনজি নিয়ে সার্সন রোডের পাহাড়ের উপরে **চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ ডাক বাংলো**তে পৌঁছালাম। পাহাড়ি পথ বৃষ্টিতে ভিজে চকচক করছিল। কেয়ারটেকার দেলোয়ার এলেন কিছুক্ষণ পর, আরেকজন কেয়ারটেকার যিশু হোটেল থেকে আনা খাবার টেবিলে সাজিয়ে দিল। ডাইনিং হলের উষ্ণ আলো, বাইরের ঝিরঝির বৃষ্টি—ঘুমের আমন্ত্রণ অগ্রাহ্য করা গেল না।

৮ আগস্ট ২০২৫ – শুক্রবার সকালে আম্মু হাজী মহসিন কলেজে, আর আব্বু নাসিরাবাদ মহিলা কলেজে পরীক্ষার দায়িত্বে গেলেন। আমি আম্মুর সাথে কলেজে গেলাম—টিলার উপর থাকা এই কলেজ থেকে শহরের অর্ধেকটা দেখা যায়।

দুপুরে পরীক্ষা শেষে আমরা গনি বেকারি রোডের মেজবানি হোটেলে গেলাম। গরুর মাংস, মেজবানি ডাল আর লইট্টা শুঁটকির ঝাঁঝ—পাহাড়ি ভ্রমণের প্রস্তুতি যেন প্লেটে সাজানো।

বিকেলে গাড়ি ভাড়া করে বান্দরবানের পথে রওনা দিলাম। তিন ঘণ্টার পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ, বৃষ্টিতে ভেজা বাতাস, মাঝে মাঝে দূরের ঝর্ণার শব্দ—সব মিলিয়ে যাত্রাটা হয়ে উঠল এক আলাদা অভিজ্ঞতা। সন্ধ্যায় পৌঁছালাম উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের গেস্ট হাউসে,সাদামাটা কিন্তু আরামদায়ক, আর বারান্দা থেকে রাতের বান্দরবান শহরের ঝিকিমিকি আলো দেখা যাচ্ছিল।

৯আগস্ট ২০২৫ – শনিবার সকালবেলা নাস্তা সেরে শুরু হলো আমাদের পাহাড়ি অভিযান। প্রথমে গেলাম নীলগিরি পাহাড়ের গায়ে আঁকাবাঁকা রাস্তা, আর উপরে উঠতে উঠতে চারপাশের মেঘ যেন হাতছানি দিচ্ছে। চূড়ায় দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, আমরা আকাশের মধ্যে আছি।

তারপর গেলাম থানচি বাজার এখান থেকে সাঙ্গু নদী পাড়ি দিয়ে নৌকায় চিংড়ি ঝর্ণার পথে। পাহাড়ি বাতাসে ভেজা চুল, বড় বড় প্রজাপতির মেলা, আর গাছের ডালে মুনিয়া পাখির বাসা বানানোর দৃশ্য সব মিলিয়ে যেন প্রাকৃতিক এক সিনেমা।

চিংড়ি ঝর্ণায় পৌঁছে ঠান্ডা পানিতে গোসল করলাম। সাদা ফেনা ছড়িয়ে পড়ছিল চারপাশে, আর ঠান্ডা পানি গায়ে লাগতেই গা শিরশির করে উঠল। সন্ধ্যায় ফিরে এলাম এবং রাত কাটালাম নীলাচল রিসোর্টে এখান থেকে বান্দরবান শহরের রাতের দৃশ্য স্বপ্নের মতো লাগে।

১০ আগস্ট ২০২৫ – রবিবার সারাদিন নীলাচল রিসোর্টে পাহাড়ি সৌন্দর্যের মধ্যে কাটল। সকালে বারান্দা থেকে দেখি মেঘে ঢাকা বান্দরবান—নিচে শহর, উপরে ঝিরঝির বৃষ্টি। রিসোর্টের উঠোনে ছিল কাঠের দোলনা, পাটের রশি দিয়ে বাঁধা—আমার প্রিয় জায়গা হয়ে গেল।

দুপুরে তঙ রিসোর্টে খেতে গেলাম—বাশখোড়ল, ব্যাম্বু চিকেন, পেঁপে, আনারস—সবকিছুই ছিল পাহাড়ি স্বাদের ভরপুর। রাতে বাইরে নিশাচরের ডাক আর ভেতরে উষ্ণ আলোয় ডিনার—যেন পাহাড়ি রূপকথা।

১১ আগস্ট ২০২৫ – সোমবার সকালে রওনা দিলাম মেঘলা স্পট দেখতে। ঝুলন্ত ব্রিজে পা রাখতেই নিচের জলাশয় আর চারপাশের পাহাড় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে। সময়ের অভাবে ক্যাবল কারে চড়া হলো না, কিন্তু ব্রিজে দাঁড়িয়ে বাতাসে দুলতে থাকা মুহূর্তটা মনে গেঁথে গেল।

এরপর গেলাম রূপালি ঝর্ণা ঝকঝকে পানির ধারা, ঠান্ডা ফোয়ারায় গোসল, আর পাহাড়ি বাতাসের গন্ধ।

দুপুরে পাহাড়ি ফল খাওয়া হলো—মিষ্টি আনারস আর পাকা পেঁপে। বিকেলে শেষবারের মতো নীলাচল রিসোর্টের বারান্দা থেকে বান্দরবানের সূর্যাস্ত দেখলাম।

রাত ৯টায় বান্দরবান থেকে চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকার পথে রওনা দিলাম।

১২ আগস্ট ২০২৫ – মঙ্গলবার ভোর ৭টায় ঢাকায় পৌঁছালাম। জানালার বাইরের শহরের ভিড় দেখে মনে হচ্ছিল—আমি যেন এখনও পাহাড়ের মেঘে আছি, নিশাচরের ডাক শুনছি, আর কাঠের দোলনায় দুলছি।

এই ভ্রমণ আমার কাছে শুধু জায়গা দেখা নয়, বরং পাহাড়, মেঘ, বৃষ্টি আর মানুষের গল্পের সাথে এক গভীর বন্ধন তৈরি করে দিয়েছে।