
মোঃ শামীম হোসেন : প্রতি টন অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম গত বছরের ডিসেম্বরে ছিল ১ হাজার ১০৫ ডলার। গত আগস্টে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩১ ডলারে। আবার কিছুটা বেড়ে সেপ্টেম্বরে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৪ ডলারে। তবে সার্বিকভাবে তেলের দাম নিম্নমুখী। গত ডিসেম্বরের তুলনায় সয়াবিনের দাম কমেছে ৫ দশমিক ৫২ শতাংশ। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও দেশের বাজারে দাম ঊর্ধ্বমুখী। বিক্রেতারা চাহিদা দিয়েও অনেক কোম্পানির কাছ থেকে চাহিদামাফিক বোতলজাত সয়াবিন তেল পাচ্ছে না। ১০ কার্টন তেল চাহিদা দিলে দুই কার্টন তেল দেওয়া হচ্ছে। কোম্পানিগুলো ইচ্ছা করেই এমনটা করেছে- যাতে রোজার আগে ভোজ্যতেলের দাম বাড়িয়ে বাড়তি মুনাফা করতে পারে।
এতে খোলা তেলের চাহিদাও বেড়েছে। ফলে কিছু বিক্রেতা খোলা তেলের দাম বেশি হওয়ায় বোতলজাত তেলের মুখ খুলে খোলা তেলের ড্রামে ঢেলে বিক্রি করছেন। এতে বাজারে বোতলজাত তেলেরও সংকট দেখা দিয়েছে। কোম্পানিগুলো বলেছে কিছুদিনের মধ্যে সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে আসবে। রোজা যত ঘনিয়ে আসছে, ভোজ্যতেলের বাজারে অসাধু চক্রের কারসাজি তত বাড়ছে। কোমর বেঁধে সক্রিয় হচ্ছে সেই পুরোনো সিন্ডিকেট। পরিস্থিতি এমন-রোজা শুরুর চার মাস আগেই কোম্পানিগুলো মিল পর্যায় থেকে তেলের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছে। ডিলারের কাছে সরবরাহ কমিয়েছে। এতে ডিলার থেকে খুচরা বাজারে সরবরাহ কমিয়ে বাড়ানো হচ্ছে দাম। তবে বাড়তি দামেও চাহিদামতো তেল পাচ্ছেন না খুচরা বিক্রেতারা। এতে বাজার থেকে এক প্রকার উধাও হচ্ছে সয়াবিন তেল। তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ ক্রেতাদের ভিড় বাড়ছে খোলাবাজারে। সোমবার দাকোপের বেশকয়েকটি বাজার ঘুরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। এদিকে তেলের দাম সহনীয় রাখতে ১৭ অক্টোবর পাম ও সয়াবিন তেলের মূল্য সংযোজন কর ১৫ শতাংশ কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। এছাড়া উৎপাদন ও ব্যবসা পর্যায়ে সয়াবিন ও পাম তেলের মূল্য সংযোজন কর অব্যাহতি দেওয়া হয়। ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই সুবিধা কার্যকর থাকবে।
তবে মাসের ব্যবধানে লিটারে ২০ টাকা বেড়ে খোলা সয়াবিন খুচরা বাজারে ১৮৫ টাকা বিক্রি হচ্ছে। আর লিটারে ৩ টাকা বেড়ে বোতলজাত বিক্রি হচ্ছে ১৬৭-১৭০ টাকা। সঙ্গে ১৫ দিনের ব্যবধানে পাম তেল ও রাইসব্রান তেলের দামও লিটারে ৬ থেকে ২০ টাকা বেশিতে বিক্রি হচ্ছে। এতে আসন্ন রোজায় বাজার আরও অস্থির হওয়ার আশঙ্কা করছেন ভোক্তারা। তারা বলছেন, প্রতিবছরের মতো এবারও রমজানে বাড়তি দরেই ভোজ্যতেল কিনতে হবে। বুধবার বাজুয়া বাজারের মুদি বিক্রেতা তপন রায় বলেন, ১৫ দিন আগেও পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল ৭৯০-৮০০ টাকা দিয়ে কিনে খুচরা পর্যায়ে ৮১৮ টাকায় বিক্রি করতাম। এখন পাওয়া যাচ্ছে না। ডিলাররা অল্প পরিমাণে সরবরাহ করছেন। তাই ডিলাররা সংকট দেখিয়ে আজও (বুধবার) ৮১০ টাকা দিয়ে বিক্রি করেছে। তবে সরকার নির্ধারিত পণ্যের গায়ের লিখিত খুচরা মূল্য ৮১৮ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। এছাড়া এক লিটারের বোতলজাত তেলেও একই অবস্থা। এক লিটারের বোতলজাত সয়বিন তেল ১৬৭-১৭০ টাকা খুচরা মূল্যে বিক্রি করতে হচ্ছে। এ তেল ডিলারদের কাছ থেকে ১৬২ টাকা দিয়ে কিনতাম।
এখন ১৬৫ টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে। রূপচাঁদা, তীর, বসুন্ধরা, ফ্রেশসহ সব কোম্পানি একই রেট ধরে দিচ্ছে। তিনি জানান, আগে কম দামে কিনে সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি করতাম। এখন কোম্পানি দাম বাড়ানোর পর আমাদের বেশি দামে সয়াবিন তেল কিনতে হচ্ছে। কিন্তু বিক্রি করতে হচ্ছে সেই সরকারি দামেই। এছাড়া কোম্পানিগুলোর ডিলাররা সয়াবিন তেল সরবরাহও অনেক কমিয়েছে। বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে। চাহিদা দিয়েও অনেক কোম্পানির কাছ থেকে চাহিদামাফিক বোতলজাত তেল পাওয়া যাচ্ছে না। কোম্পানি দিচ্ছে না। দশ কার্টন তেল চাহিদা দিলে দুই কার্টন তেল দেওয়া হচ্ছে। যে কারণেও খুচরা বাজারে বোতলজাত তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। কোম্পানিগুলো ইচ্ছা করেই এমনটা করেছে। যাতে রোজার আগে ভোজ্যতেলের দাম বাড়িয়ে বাড়তি মুনাফা করতে পারে। তাই এখন থেকেই এ বিষয়ে নজর দিতে হবে। বাজুয়া কাঁচাবাজারের মুদি বিক্রেতা খোকন জানান, বাজার থেকে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। ডিলারদের কাছ থেকে প্রতিলিটার খোলা সয়াবিন ১৮২ টাকায় কিনতে হচ্ছে। আর খুচরা পর্যায়ে বিক্রি করতে হচ্ছে ১৮৫ টাকা। তবে ১৫ দিন আগেও তা ১৫৭-১৫৮ টাকায় ডিলারদের কাছ থেকে কিনতাম। খুচরা বিক্রি করতাম ১৬০ টাকা। তিনি জানান, দাম বাড়ায় খোলা সয়াবিন এখন বিক্রি করছি না।
এটির দাম বোতল থেকে অনেক। তবে নিম্নবিত্ত ও খেটেখাওয়া মানুষ একবারে বেশি দামে দিয়ে এক লিটারের বোতলজাত তেলও কিনতে পারছে না। এতে খোলা তেলের চাহিদাও বেড়েছে। ফলে কিছু বিক্রেতা খোলা তেলের দাম বেশি হওয়ায় বোতলজাত তেলের মুখ খুলে খোলা তেলের ড্রামে ঢেলে বিক্রি করছেন। এতে বাজারে বোতলজাত তেলেরও সংকট দেখা দিয়েছে। দাম বাড়ার কারণ জানতে চাইলে লাউডোব খুটাখালি বাজারে কথা হয় বিভিন্ন তেল কোম্পানির ডিলারদের সঙ্গে। তারা বলেন, কোম্পানি থেকে আমাদের তেল সরবরাহ করছে না। কম করে সয়াবিন তেল সরবরাহ করছে। যেখানে একজন ডিলারের চাহিদা ১০০ কার্টন, সেখানে কোম্পানি ২০-৩০ কার্টন তেল দিচ্ছে। এ কারণে বাজারে সরবরাহ কমাতে হচ্ছে। যে কারণে খুচরা পর্যায়ে বোতলজাত তেলের সংকট দেখা দিচ্ছে। তবে কোম্পানিগুলো বলেছে কিছুদিনের মধ্যে সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
অন্যদিকে খুচরা বাজারে খোলা পাম তেল বিক্রি হচ্ছে ১৫৬ টাকা, যা এক সপ্তাহ আগেও ১৫০ টাকা ছিল। আর পাম অয়েল সুপার বিক্রি হচ্ছে লিটারপ্রতি ১৬০ টাকা, যা আগে ১৫৪ টাকা ছিল। এছাড়া খুচরা পর্যায়ে প্রতি লিটার বোতলজাত রাইসব্রান তেল বিক্রি হচ্ছে ২০০-২১০ টাকা, যা এক সপ্তাহ আগে লিটারপ্রতি বিক্রি হয়েছে ১৮৫-১৯৫ টাকা। পাঁচ লিটারের বোতলজাত রাইসব্রান তেল বিক্রি হচ্ছে ৯৮০-১০৫০ টাকা, যা সাতদিন আগেও ৮৮০-৯২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। বাজার করতে আসা আবদুল রহমান বলেন, রোজা ঘিরে কয়েক বছর ধরে অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট একটি পন্থা অবলম্বন করছে। রোজায় দাম না বাড়িয়ে রোজা শুরুর তিন থেকে চার মাস আগেই পণ্যের দাম বাড়িয়ে রাখছে। এতে রোজায় ক্রেতারা বাড়তি দরেই পণ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। আর অতি মুনাফা লুফে নিচ্ছে সেই চিরচেনা সিন্ডিকেট। তাই এখন থেকেই কর্তৃপক্ষকে নজর দিতে হবে।
Reporter Name 








