9:56 pm, Monday, 2 November 2026

খুলনাসহ বিভাগীয় শহরে বিলুপ্তির পথে খেজুর গাছ ও গাছিরা

  • Reporter Name
  • Update Time : 07:16:37 pm, Saturday, 9 December 2023
  • 18 Time View

মোঃশামীম হোসেন,খুলনা প্রতিনিধি: খুলনাসহ বিভাগীয় শহরে বিলুপ্তির পথে খেজুর গাছ ও গাছিরা। কথায় আছে ‘যশোরের যশ খেজুরের রস’। সেই খেজুরের রস দিনে দিনে কমে যাচ্ছে যশোরের শার্শায়। শীতের আগমনের শুরুতেই গ্রামীণ সংস্কৃতিতে নতুন মাত্রা যোগ হয় খেজুর গাছ হতে রস সংগ্রহের ধুম। গ্রামীণ জনপদের ঘরে ঘরে খেজুর রসের সমারোহ। গ্রামে এখন শহুরে ছোঁয়া। শহরায়নের আগ্রাসনে প্রকৃতির ঐতিহ্য খেজুর গাছ হারিয়ে যাচ্ছে। দিন যত যাচ্ছে খেজুর গাছও তত কমছে। খেজুর গাছের রস ও গুড় আমাদের সংস্কৃতির একটি বিশেষ অংশ। শীতের সকালে খেজুরের রস, রসের পিঠা, গুড়-মুড়ি আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্য।

শার্শা উপজেলার বাগআঁচড়াসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রামের আঁকা-বাঁকা রাস্তায় গত কয়েক বছর আগেও শত শত খেজুর গাছ ছিল। ওইসব গাছ থেকে শীতকালে যত খেজুরের রস সংগ্রহ হতো তা দিয়ে প্রয়োজনীয় চাহিদা মিটিয়ে তৈরি হতো খেজুরের গুড়, যা এখন আর চোখে মিলছে না। ফলে বাজার সয়লাব হয়ে গেছে নকল গুড়ে। এখন এসব গুড়েই তৈরি হচ্ছে পিঠা-পুলিসহ অন্যান্য মিষ্টান্ন। গাছি সংকট, অবহেলা, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও নগরায়ণের প্রতিযোগিতায় ক্রমেই এখানে হারিয়ে যাচ্ছে খেজুর গাছ।

শীতে খেজুরের রসের সঙ্গে গ্রামবাংলার প্রতিটি মানুষের সম্পর্ক বেশ পুরনো ও নিবিড়। তবে নানা কারণে গাছের রসের স্বাদ ভুলতে বসেছেন মানুষ। বর্তমানে ইটভাটার জ্বালানি হিসেবে খেজুরের গাছ ব্যবহার ও গাছিসংকটে তেমনভাবে আর রস সংগ্রহ করা হয় না। ফলে হারাতে বসেছে একসময়ের রস সংগ্রহের ঐতিহ্যে। বাগআঁচড়ার গাছি শহিদুল ইসলাম জানান, খেজুরের গাছ কমে যাওয়ায় তাদের চাহিদাও কমে গেছে। আগে এই কাজ করে ভালোভাবেই সংসার চালাতেন। এমনকি আগে যে আয় রোজগার হতো তাতে সঞ্চয়ও থাকতো, যা দিয়ে বছরের আরো কয়েক মাস সংসারের খরচ চলতো। এখন গ্রামে যে কয়েকটা খেজুর গাছ আছে তা বুড়ো হয়ে যাওয়ায় রস তেমন পাওয়া যায় না। রস বাজারে বিক্রির মতো আগের সেই অবস্থা নেই। তিনি আরো বলেন, কয়েক বছর আগে এক হাড়ি খেজুর রস বিক্রি করতাম ২০ টাকা। এখন খেজুর গাছ না থাকায় সে রসের দাম বেড়ে হয়েছে ২০০ টাকা।

কায়বা ইউনিয়নের দিঘা গ্রামের প্রবীণ অধিবাসী সুরোত আলি বলেন, কায়বা ইনিয়নসহ শার্শা থানায় প্রায় প্রতিটি গৃহস্থ বাড়িতে অন্তত ১০ থেকে ১৫টি বা আরও বেশি খেজুর গাছ ছিল, যা প্রায় বিলুপ্ত। আমাদের দিঘা গ্রামে অন্তত ৫০০টি খেজুর গাছ ছিল। এখন বাড়ি/ঘর হয়ে যাওয়ায় খেজুর গাছ আর নেই। আগে অনেক গাছও ছিল, গাছিও ছিল। এখন গাছ ও গাছি কোনোটাই নেই। বৃক্ষপ্রেমিক কলেজ ছাত্র আনান্দ সরকার নিরব বলেন, খেজুর গাছ বাণিজ্যিক ভাবে রোপন করাতে কৃষকদের উৎসাহিত করতে হবে। বর্তমানে গাছির সংখ্যাও কমে এসেছে। এজন্য গাছি তৈরিতে মানুষকে উৎসাহিত করতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে খেজুরের রস, গুড়ের বিষয়ে যেন কেবল পুস্তকে না পড়তে হয় সে বিষয়ে সচেতন হতে হবে আমাদের। আমি ইতিমধ্যে করোনাকালীন সময়ে অনেক খেজুর গাছ রোপন করেছিলাম। আর আমার বাড়ির নার্সারিতে অনেক খেজুরের চারাও বসানো আছে। যশোরের ঐতিহ্য খেজুর গাছ সংরক্ষণে আমি সারাজীবন প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবো।
বিশিষ্ট সংবাদকর্মী আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, যশোরের ঐতিহ্যবাহী গুড়-পাটালির ইতিহাস অনেক প্রাচীন। ব্রিটিশ আমলে খেজুর গুড় থেকে চিনি তৈরি করা হতো। এই চিনি ‘ব্রাউন সুগার’ নামে পরিচিত ছিল। এই চিনি ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাঠানো হত। খেজুর রসের জন্য যশোরের খ্যাতি দীর্ঘদিনের। নানা কারণে শত বছরের এই ঐতিহ্য ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে।
Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে উত্তাল গোয়াইনঘাট : বিএনপি নেতা স্টেলিং তারিয়াংয়ের সমর্থনে তৃণমূলের মানববন্ধনের ঘোষণা

খুলনাসহ বিভাগীয় শহরে বিলুপ্তির পথে খেজুর গাছ ও গাছিরা

Update Time : 07:16:37 pm, Saturday, 9 December 2023

মোঃশামীম হোসেন,খুলনা প্রতিনিধি: খুলনাসহ বিভাগীয় শহরে বিলুপ্তির পথে খেজুর গাছ ও গাছিরা। কথায় আছে ‘যশোরের যশ খেজুরের রস’। সেই খেজুরের রস দিনে দিনে কমে যাচ্ছে যশোরের শার্শায়। শীতের আগমনের শুরুতেই গ্রামীণ সংস্কৃতিতে নতুন মাত্রা যোগ হয় খেজুর গাছ হতে রস সংগ্রহের ধুম। গ্রামীণ জনপদের ঘরে ঘরে খেজুর রসের সমারোহ। গ্রামে এখন শহুরে ছোঁয়া। শহরায়নের আগ্রাসনে প্রকৃতির ঐতিহ্য খেজুর গাছ হারিয়ে যাচ্ছে। দিন যত যাচ্ছে খেজুর গাছও তত কমছে। খেজুর গাছের রস ও গুড় আমাদের সংস্কৃতির একটি বিশেষ অংশ। শীতের সকালে খেজুরের রস, রসের পিঠা, গুড়-মুড়ি আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্য।

শার্শা উপজেলার বাগআঁচড়াসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রামের আঁকা-বাঁকা রাস্তায় গত কয়েক বছর আগেও শত শত খেজুর গাছ ছিল। ওইসব গাছ থেকে শীতকালে যত খেজুরের রস সংগ্রহ হতো তা দিয়ে প্রয়োজনীয় চাহিদা মিটিয়ে তৈরি হতো খেজুরের গুড়, যা এখন আর চোখে মিলছে না। ফলে বাজার সয়লাব হয়ে গেছে নকল গুড়ে। এখন এসব গুড়েই তৈরি হচ্ছে পিঠা-পুলিসহ অন্যান্য মিষ্টান্ন। গাছি সংকট, অবহেলা, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও নগরায়ণের প্রতিযোগিতায় ক্রমেই এখানে হারিয়ে যাচ্ছে খেজুর গাছ।

শীতে খেজুরের রসের সঙ্গে গ্রামবাংলার প্রতিটি মানুষের সম্পর্ক বেশ পুরনো ও নিবিড়। তবে নানা কারণে গাছের রসের স্বাদ ভুলতে বসেছেন মানুষ। বর্তমানে ইটভাটার জ্বালানি হিসেবে খেজুরের গাছ ব্যবহার ও গাছিসংকটে তেমনভাবে আর রস সংগ্রহ করা হয় না। ফলে হারাতে বসেছে একসময়ের রস সংগ্রহের ঐতিহ্যে। বাগআঁচড়ার গাছি শহিদুল ইসলাম জানান, খেজুরের গাছ কমে যাওয়ায় তাদের চাহিদাও কমে গেছে। আগে এই কাজ করে ভালোভাবেই সংসার চালাতেন। এমনকি আগে যে আয় রোজগার হতো তাতে সঞ্চয়ও থাকতো, যা দিয়ে বছরের আরো কয়েক মাস সংসারের খরচ চলতো। এখন গ্রামে যে কয়েকটা খেজুর গাছ আছে তা বুড়ো হয়ে যাওয়ায় রস তেমন পাওয়া যায় না। রস বাজারে বিক্রির মতো আগের সেই অবস্থা নেই। তিনি আরো বলেন, কয়েক বছর আগে এক হাড়ি খেজুর রস বিক্রি করতাম ২০ টাকা। এখন খেজুর গাছ না থাকায় সে রসের দাম বেড়ে হয়েছে ২০০ টাকা।

কায়বা ইউনিয়নের দিঘা গ্রামের প্রবীণ অধিবাসী সুরোত আলি বলেন, কায়বা ইনিয়নসহ শার্শা থানায় প্রায় প্রতিটি গৃহস্থ বাড়িতে অন্তত ১০ থেকে ১৫টি বা আরও বেশি খেজুর গাছ ছিল, যা প্রায় বিলুপ্ত। আমাদের দিঘা গ্রামে অন্তত ৫০০টি খেজুর গাছ ছিল। এখন বাড়ি/ঘর হয়ে যাওয়ায় খেজুর গাছ আর নেই। আগে অনেক গাছও ছিল, গাছিও ছিল। এখন গাছ ও গাছি কোনোটাই নেই। বৃক্ষপ্রেমিক কলেজ ছাত্র আনান্দ সরকার নিরব বলেন, খেজুর গাছ বাণিজ্যিক ভাবে রোপন করাতে কৃষকদের উৎসাহিত করতে হবে। বর্তমানে গাছির সংখ্যাও কমে এসেছে। এজন্য গাছি তৈরিতে মানুষকে উৎসাহিত করতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে খেজুরের রস, গুড়ের বিষয়ে যেন কেবল পুস্তকে না পড়তে হয় সে বিষয়ে সচেতন হতে হবে আমাদের। আমি ইতিমধ্যে করোনাকালীন সময়ে অনেক খেজুর গাছ রোপন করেছিলাম। আর আমার বাড়ির নার্সারিতে অনেক খেজুরের চারাও বসানো আছে। যশোরের ঐতিহ্য খেজুর গাছ সংরক্ষণে আমি সারাজীবন প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবো।
বিশিষ্ট সংবাদকর্মী আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, যশোরের ঐতিহ্যবাহী গুড়-পাটালির ইতিহাস অনেক প্রাচীন। ব্রিটিশ আমলে খেজুর গুড় থেকে চিনি তৈরি করা হতো। এই চিনি ‘ব্রাউন সুগার’ নামে পরিচিত ছিল। এই চিনি ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাঠানো হত। খেজুর রসের জন্য যশোরের খ্যাতি দীর্ঘদিনের। নানা কারণে শত বছরের এই ঐতিহ্য ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে।