11:18 am, Monday, 2 November 2026

নবীজি যেভাবে পানি পান করতেন

  • Reporter Name
  • Update Time : 05:38:37 pm, Monday, 24 January 2022
  • 65 Time View

নবীজি যেভাবে পানি পান করতেন। মহান রাব্বুল আলামিনের নিয়ামতসমূহের মধ্যে পানি অন্যতম। পানি ছাড়া মানুষের জীবনধারণ অসম্ভব। কেননা পৃথিবীর সব প্রাণের উৎস পানি এবং আমরা সবাই পানির ওপর নির্ভরশীল। আল্লাহতায়ালা পানিকে শুধুমাত্র মানুষের পান করার চাহিদা মেটানোর জন্যই তৈরি করেননি। পানিকে করেছেন সৃষ্টির বিভিন্ন কাজের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ।

এছাড়া খাওয়া-দাওয়া, চলাফেরা, চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য সব কিছুই মানুষের জন্য ইবাদত হবে যখন এসব কাজ ইসলামি পদ্ধতিতে করা হবে। যেমন মানুষের বেঁচে থাকার জন্য খাবার ও পানীয় গ্রহণ করা অত্যন্ত আবশ্যক। আবার জীবনধারণে পানি পান করাও আবশ্যক। পানির অপর নাম জীবন। জীবন বাঁচাতে পানি পানের বিকল্প নেই।

সব সৃষ্টিরই বেঁচে থাকার তাগিদে পানি পান করতে হয়। আর মানুষের পানি পানে রয়েছে কিছু ইসলামি নিয়ম ও পদ্ধতি। কাজটি ছোট হলেও প্রতিদিন অনেকবার মানুষকে পানি পান করতে হয়। পানি পানের সময় স্বয়ং বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুনির্দিষ্ট কিছু আমল করতেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাস্তব জীবনের এ আমলগুলো উঠে এসেছে হাদিসের বর্ণনায়।

পানি পান করার সুন্নতসমূহ:

১.ডান হাতে পান করা। কেননা শয়তান বাম হাত দিয়ে পানি পান করে। (সহিহ মুসলিম ২/১৭২)

২.বসে পান করা, দাঁড়িয়ে পান করা নিষেধ। (সহিহ মুসলিম ২/১৭৩)

৩. শুরুতে (বিছমিল্লাহ) পড়া এবং শেষে (আলহামদু লিল্লাহ) পড়া। (সুনানে তিরমিযী ২/১০)

৪. তিন নিঃশ্বাসে পানি পান করা, নিঃশ্বাস ফেলার সময় গ্লাস থেকে মুখ আলাদা করা। (সহিহ মুসলিম ২/১৭৪)

৫. গ্লাসের ভাঙা অংশের দিক দিয়ে পান না করা। (সুনানে আবু দাউদ ২/১৬৭)

৬. জগ ইত্যাদি বড় পাত্রে মুখ লাগিয়ে পান করবেন না। কেননা এতে বেশি পানি চলে আসার বা সাপ-বিচ্ছু থাকার সম্ভাবনা থাকে। (বুখারী ২/৮৪১, মুসলিম ২/১৭৩)

৭. পানি পান করার পর অন্যজনকে দিতে হলে প্রথমে ডান পাশের জনকে দিবেন। সেও তার ডান পাশের জনকে দিবেন, এভাবেই চলবে। চা ও অন্যান্য পানীয়ের ক্ষেত্রে এটাই নিয়ম। (বুখারী ২/৮৪০ ও মুসলিম ২/১৭৪)

৮. ওজু করার পর যে পাত্রে হাত দিয়ে পানি নেয়া হয়, সে পাত্রের অবশিষ্ট পানি কিবলামুখী হয়ে দাঁড়িয়ে পান করা। এতে বিভিন্ন রোগ-ব্যাধি হতে আরোগ্য লাভ হয়। (বুখারী শরীফ, হাদীস নং- ৫৬১৬)

৯. পানীয় দ্রব্য পান করে কাউকে দিতে হলে ডান দিকের ব্যক্তিকে আগে দেয়া এবং এই ধারাবাহিকতা অনুযায়ীই শেষ করা। (বুখারী শরীফ, হাদীস নং- ৫৬১৯)

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন, ‘আর আমি প্রাণবান সবকিছু সৃষ্টি করলাম পানি হতে, তবুও কি তারা ঈমান আনবে না? (আম্বিয়া ৩০)।

আল্লাহ তায়ালা আরো ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা যে পানি পান কর, সে সম্পর্কে কি তোমরা চিন্তা করেছ? তোমরাই কি তা মেঘ হতে নামিয়ে আন, না আমি তা বর্ষণ করি? আমি ইচ্ছা করলে তা লবণাক্ত করে দিতে পারি। তবুও কেন তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর না? (ওয়াক্বিয়াহ ৬৮-৭০)।

আল্লাহ তায়ালা মাখলুক সৃষ্টিতে পানি ব্যবহার করেছেন। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন, আল্লাহ সমস্ত জীব সৃষ্টি করেছেন পানি হতে, ওদের কতেক পেটে ভর দিয়ে চলে (সাপ), কতেক দুই পায়ে চলে (মানুষ) এবং কতেক চলে চার পায়ে (জন্তু-জানোয়ার) আল্লাহ যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন, আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্ব শক্তিমান।’ (সুরা: নুর : আয়াত : ৪৫)।

আল্লাহ অন্যত্র বলেন, অবিশ্বাসীরা কি ভেবে দেখেনা যে, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর মুখ বন্ধ ছিল, অতঃপর আমি উভয়কে খুলে দিলাম, এবং প্রাণবন্ত সবকিছু আমি পানি থেকে সৃষ্টি করলাম। এরপরও কি তারা বিশ্বাস স্থাপন করবে না। (সুরা: আম্বিয়া, আয়াত : ৩০)।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানুষের জীবিকা তথা ফলমূল তৈরিতে পরিমাণ মতো পানি দান করে থাকেন। যা ছাড়া কোনো ফলমূল উৎপন্ন হতো না।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, যে পবিত্রসত্তা তোমাদের জন্য ভূমিকে বিছানা এবং আকাশকে ছাদ স্বরূপ স্থাপন করে দিয়েছেন, আর আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে তোমাদের জন্য ফল-ফসল উৎপাদন করেছেন তোমাদের খাদ্য হিসেবে। অতএব, আল্লাহর সঙ্গে তোমরা অন্য কাউকে সমকক্ষ করো না। বস্তুতঃ এসব তোমরা জান।’ (সুরা: বাকারা, আয়াত : ২২)।

হজরত সাহল ইবনু সা‘দ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে একটি পেয়ালা আনা হল। তিনি তা হতে পান করলেন। তখন তার ডান দিকে ছিল একজন বয়ঃকনিষ্ঠ বালক আর বয়স্ক লোকেরা ছিলেন তার বাম দিকে।

তিনি বললেন, হে বালক! তুমি কি আমাকে অবশিষ্ট (পানিটুকু) বয়স্কদেরকে দেওয়ার অনুমতি দিবে? সে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! আপনার নিকট থেকে ফজিলত পাওয়ার ব্যাপারে আমি আমার চেয়ে অন্য কাউকে প্রাধান্য দিব না। অতঃপর তিনি তা তাকে প্রদান করলেন। (২৩৬৬, ২৪৫১, ২৬০২, ২৬০৫, ৫৬২০, মুসলিম ৩৬/১৭, হাদিস ২০৩০, আহমাদ ২২৮৮৭)।

আল্লাহতায়ালা সবাইকে নিত্যদিনের প্রত্যেকটি কাজে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সুন্নত মোতাবেক চলার তৌফিক দান করুন। আমিন।
(সংকলনে : মোজাম্মেল হক লিটন, নোয়াখালী প্রতিনিধিঃ)

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে উত্তাল গোয়াইনঘাট : বিএনপি নেতা স্টেলিং তারিয়াংয়ের সমর্থনে তৃণমূলের মানববন্ধনের ঘোষণা

নবীজি যেভাবে পানি পান করতেন

Update Time : 05:38:37 pm, Monday, 24 January 2022

নবীজি যেভাবে পানি পান করতেন। মহান রাব্বুল আলামিনের নিয়ামতসমূহের মধ্যে পানি অন্যতম। পানি ছাড়া মানুষের জীবনধারণ অসম্ভব। কেননা পৃথিবীর সব প্রাণের উৎস পানি এবং আমরা সবাই পানির ওপর নির্ভরশীল। আল্লাহতায়ালা পানিকে শুধুমাত্র মানুষের পান করার চাহিদা মেটানোর জন্যই তৈরি করেননি। পানিকে করেছেন সৃষ্টির বিভিন্ন কাজের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ।

এছাড়া খাওয়া-দাওয়া, চলাফেরা, চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য সব কিছুই মানুষের জন্য ইবাদত হবে যখন এসব কাজ ইসলামি পদ্ধতিতে করা হবে। যেমন মানুষের বেঁচে থাকার জন্য খাবার ও পানীয় গ্রহণ করা অত্যন্ত আবশ্যক। আবার জীবনধারণে পানি পান করাও আবশ্যক। পানির অপর নাম জীবন। জীবন বাঁচাতে পানি পানের বিকল্প নেই।

সব সৃষ্টিরই বেঁচে থাকার তাগিদে পানি পান করতে হয়। আর মানুষের পানি পানে রয়েছে কিছু ইসলামি নিয়ম ও পদ্ধতি। কাজটি ছোট হলেও প্রতিদিন অনেকবার মানুষকে পানি পান করতে হয়। পানি পানের সময় স্বয়ং বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুনির্দিষ্ট কিছু আমল করতেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাস্তব জীবনের এ আমলগুলো উঠে এসেছে হাদিসের বর্ণনায়।

পানি পান করার সুন্নতসমূহ:

১.ডান হাতে পান করা। কেননা শয়তান বাম হাত দিয়ে পানি পান করে। (সহিহ মুসলিম ২/১৭২)

২.বসে পান করা, দাঁড়িয়ে পান করা নিষেধ। (সহিহ মুসলিম ২/১৭৩)

৩. শুরুতে (বিছমিল্লাহ) পড়া এবং শেষে (আলহামদু লিল্লাহ) পড়া। (সুনানে তিরমিযী ২/১০)

৪. তিন নিঃশ্বাসে পানি পান করা, নিঃশ্বাস ফেলার সময় গ্লাস থেকে মুখ আলাদা করা। (সহিহ মুসলিম ২/১৭৪)

৫. গ্লাসের ভাঙা অংশের দিক দিয়ে পান না করা। (সুনানে আবু দাউদ ২/১৬৭)

৬. জগ ইত্যাদি বড় পাত্রে মুখ লাগিয়ে পান করবেন না। কেননা এতে বেশি পানি চলে আসার বা সাপ-বিচ্ছু থাকার সম্ভাবনা থাকে। (বুখারী ২/৮৪১, মুসলিম ২/১৭৩)

৭. পানি পান করার পর অন্যজনকে দিতে হলে প্রথমে ডান পাশের জনকে দিবেন। সেও তার ডান পাশের জনকে দিবেন, এভাবেই চলবে। চা ও অন্যান্য পানীয়ের ক্ষেত্রে এটাই নিয়ম। (বুখারী ২/৮৪০ ও মুসলিম ২/১৭৪)

৮. ওজু করার পর যে পাত্রে হাত দিয়ে পানি নেয়া হয়, সে পাত্রের অবশিষ্ট পানি কিবলামুখী হয়ে দাঁড়িয়ে পান করা। এতে বিভিন্ন রোগ-ব্যাধি হতে আরোগ্য লাভ হয়। (বুখারী শরীফ, হাদীস নং- ৫৬১৬)

৯. পানীয় দ্রব্য পান করে কাউকে দিতে হলে ডান দিকের ব্যক্তিকে আগে দেয়া এবং এই ধারাবাহিকতা অনুযায়ীই শেষ করা। (বুখারী শরীফ, হাদীস নং- ৫৬১৯)

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন, ‘আর আমি প্রাণবান সবকিছু সৃষ্টি করলাম পানি হতে, তবুও কি তারা ঈমান আনবে না? (আম্বিয়া ৩০)।

আল্লাহ তায়ালা আরো ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা যে পানি পান কর, সে সম্পর্কে কি তোমরা চিন্তা করেছ? তোমরাই কি তা মেঘ হতে নামিয়ে আন, না আমি তা বর্ষণ করি? আমি ইচ্ছা করলে তা লবণাক্ত করে দিতে পারি। তবুও কেন তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর না? (ওয়াক্বিয়াহ ৬৮-৭০)।

আল্লাহ তায়ালা মাখলুক সৃষ্টিতে পানি ব্যবহার করেছেন। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন, আল্লাহ সমস্ত জীব সৃষ্টি করেছেন পানি হতে, ওদের কতেক পেটে ভর দিয়ে চলে (সাপ), কতেক দুই পায়ে চলে (মানুষ) এবং কতেক চলে চার পায়ে (জন্তু-জানোয়ার) আল্লাহ যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন, আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্ব শক্তিমান।’ (সুরা: নুর : আয়াত : ৪৫)।

আল্লাহ অন্যত্র বলেন, অবিশ্বাসীরা কি ভেবে দেখেনা যে, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর মুখ বন্ধ ছিল, অতঃপর আমি উভয়কে খুলে দিলাম, এবং প্রাণবন্ত সবকিছু আমি পানি থেকে সৃষ্টি করলাম। এরপরও কি তারা বিশ্বাস স্থাপন করবে না। (সুরা: আম্বিয়া, আয়াত : ৩০)।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানুষের জীবিকা তথা ফলমূল তৈরিতে পরিমাণ মতো পানি দান করে থাকেন। যা ছাড়া কোনো ফলমূল উৎপন্ন হতো না।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, যে পবিত্রসত্তা তোমাদের জন্য ভূমিকে বিছানা এবং আকাশকে ছাদ স্বরূপ স্থাপন করে দিয়েছেন, আর আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে তোমাদের জন্য ফল-ফসল উৎপাদন করেছেন তোমাদের খাদ্য হিসেবে। অতএব, আল্লাহর সঙ্গে তোমরা অন্য কাউকে সমকক্ষ করো না। বস্তুতঃ এসব তোমরা জান।’ (সুরা: বাকারা, আয়াত : ২২)।

হজরত সাহল ইবনু সা‘দ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে একটি পেয়ালা আনা হল। তিনি তা হতে পান করলেন। তখন তার ডান দিকে ছিল একজন বয়ঃকনিষ্ঠ বালক আর বয়স্ক লোকেরা ছিলেন তার বাম দিকে।

তিনি বললেন, হে বালক! তুমি কি আমাকে অবশিষ্ট (পানিটুকু) বয়স্কদেরকে দেওয়ার অনুমতি দিবে? সে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! আপনার নিকট থেকে ফজিলত পাওয়ার ব্যাপারে আমি আমার চেয়ে অন্য কাউকে প্রাধান্য দিব না। অতঃপর তিনি তা তাকে প্রদান করলেন। (২৩৬৬, ২৪৫১, ২৬০২, ২৬০৫, ৫৬২০, মুসলিম ৩৬/১৭, হাদিস ২০৩০, আহমাদ ২২৮৮৭)।

আল্লাহতায়ালা সবাইকে নিত্যদিনের প্রত্যেকটি কাজে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সুন্নত মোতাবেক চলার তৌফিক দান করুন। আমিন।
(সংকলনে : মোজাম্মেল হক লিটন, নোয়াখালী প্রতিনিধিঃ)