3:27 pm, Monday, 2 November 2026

দাকোপে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে প্রতিনিয়ত লড়াই করেই চলে মানুষের জীবন সংগ্রাম

  • Reporter Name
  • Update Time : 12:35:09 am, Tuesday, 12 November 2024
  • 62 Time View

মোঃ শামীম হোসেন : খুলনার দাকোপে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে প্রতিনিয়ত লড়াই করেই চলে মানুষের জীবন সংগ্রাম। এখানকার মানুষের প্রধান ফসল আমনের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু এই ফসলের একটি বৃহৎ অংশ নদী ভাঙন, খরাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দূর্যোগে নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া এখানকার নিম্নআয়ের বেশির ভাগ মানুষ সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া ধরে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। তবে দূর্যোগে এলাকায় যে পরিমাণে ক্ষতি হয় তা পুষিয়ে ওঠা এ অঞ্চলের মানুষের পক্ষে অসম্ভব। দূর্যোগ নিয়ে কাজ করা সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন এনজিও এবং সংস্থার সুযোগ সুবিধা পায় খুবই কম পরিবার। তাছাড়া ইউনিয়ন পরিষদে যে বাজেট আসে তা খুবই সামান্য। এ বাজেট দিয়ে এখানকার মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করা অসম্ভব বলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ।

এলাকাবাসী জানান, ভৌগলিক অবস্থানের কারণে পৃথক তিনটি দ্বীপের সমন্বয়ে বঙ্গোপসাগর তথা সুন্দরবন উপকূলীয় এই উপজেলা একটি পৌরসভা ও নয়টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। এখানে প্রায় সারা বছর ধরে চলে ভয়াবহ নদী ভাঙন, ঘূর্ণিঝড়সহ ছোট-বড় নানা প্রাকৃতিক দূর্যোগ।

আর স্থানীয় বাসিন্দারা প্রতিনিয়ত এসব দূর্যোগের কবলে পড়ে তাদের সহায় সম্পত্তি হারিয়ে দিন দিন নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। অনেকে সর্বস্ব হারিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশে চলেও গেছেন। এখনও পর্যন্ত অপ্রতিরোধ্য ভাঙনের কারণে ছোট্ট হয়ে আসছে জনবসতির মানচিত্র। আবার গ্রীষ্মের শুরু থেকে বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সংকট লেগে থাকে। ফলে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দূর্যোগের সাথে লড়াই করেই এ অঞ্চলের মানুষের বেঁচে থাকতে হয়।

কালাবগি এলাকার জেলে ছালাম মোল্যা বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় আইলায় সহায় সম্পত্তি যা ছিলো সব শেষ হয়ে গেছে। এখন পরিবার-পরিজন নিয়ে রাস্তার উপর ঝুপড়ি ঘরে বাস করি। আর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সুন্দরবনে মাছ-কাঁকড়া ধরে জীবিকা নির্বাহ করি। কিন্তু কাঁকড়া ও মাছের প্রজনন মৌসুমে বনে মোট পাঁচ মাস পাশ, পারমিট বন্ধ থাকে। এ সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে যে চাল দেয় তা দিয়ে সংসার চলে না। ফলে পরিবার-পরিজন নিয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে খুবই কষ্টে দিন কাটে।

তিনি বলেন, ‘এ অঞ্চলের মানুষের প্রধান আমন ফসলও বিভিন্ন প্রাকৃতিক দূর্যোগে নষ্ট হয়ে যায়। তাছাড়া এনজিও’র সুযোগ-সুবিধা পায় খুবই কম পরিবার। সরকার সুন্দরবন থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় করলেও উপকূলীয় এলাকার মানুষের উন্নয়নে সরকারের বিশেষ বরাদ্দ তেমন একটা চোখে পড়ে না। অবিলম্বে এ অঞ্চলে বিশেষ করে ক্লাইমেট রেজিলেন্স ও সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করার দাবি জানান ছালাম মোল্যা। তার মতো একাধিক ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ একই অভিমত ব্যক্ত করেন।

সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশন (সিএসও) সদস্য দান কুমারী বলেন, ‘সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসার্চ স্টাডিজ (সিএনআরএস) ইভলভ প্রকল্পের উদ্যোগে আমরা সিএসও এবং কমিউনিটি বেইজ অর্গানাইজেশন (সিবিও) প্রতিনিধিবৃন্দ জনগণসহ স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নে অংশগ্রহণ করে থাকি। কিন্তু আমাদের চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ খুবই অপ্রতুল।

সরকারের উচিৎ আমাদের দুঃখের কথা চিন্তা করে এই এলাকার জন্য বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া। অবিলম্বে এ অঞ্চলে বিশেষ করে ক্লাইমেট রেজিলেন্স ও সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করার দাবি জানান ছালাম মোল্যা। তার মতো একাধিক ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ একই অভিমত ব্যক্ত করেন। সরকারের উচিৎ আমাদের দুঃখের কথা চিন্তা করে এই এলাকার জন্য বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া।

বানিশান্ত ইউপি চেয়ারম্যান সুদেব কুমার রায় বলেন, ‘আমরা স্থানীয় জনগণকে সাথে নিয়ে এখন বার্ষিক পরিকল্পনা ও বাজেট প্রণয়ন করছি। যেখানে জলবায়ু, জেন্ডার ও সামাজিক অন্তর্ভূক্তির বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে আসছি। ফলে বাজেটে বরাদ্দের পরিমাণও বেড়েছে। যদিও কর ও সেবা মেলার মত কার্যক্রমের ফলে ইউপির নিজস্ব আয় বেড়েছে। কিন্তু বাজেট বাস্তবায়নের জন্য তা যথেষ্ট নয়।ফলে সরকারকে সুন্দরবন বেষ্টিত এ এলাকার জন্য বিশেষ বরাদ্দের দাবি জানান তিনি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসমত হোসেন বলেন, সুন্দরবন সংলগ্ন এই উপজেলার মানুষ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে প্রতিনিয়ত লড়াই করে বেঁচে থাকে। এছাড়া দূর্যোগে এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা যেমন- রাস্তাঘাট, ওয়াপদা বেড়িবাঁধসহ প্রধান ফসল আমন ধান প্রতি বছরই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে। পাশাপাশি দূর্যোগের ফলে নারী, বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে।

তাই সকল সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলো তাদের কর্মকাণ্ডে সমাজের এ সমস্ত পিছিয়ে পড়া মানুষদের অগ্রাধিকার বিবেচনায় উপজেলা প্রশাসন কাজ করে যাচ্ছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে উত্তাল গোয়াইনঘাট : বিএনপি নেতা স্টেলিং তারিয়াংয়ের সমর্থনে তৃণমূলের মানববন্ধনের ঘোষণা

দাকোপে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে প্রতিনিয়ত লড়াই করেই চলে মানুষের জীবন সংগ্রাম

Update Time : 12:35:09 am, Tuesday, 12 November 2024

মোঃ শামীম হোসেন : খুলনার দাকোপে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে প্রতিনিয়ত লড়াই করেই চলে মানুষের জীবন সংগ্রাম। এখানকার মানুষের প্রধান ফসল আমনের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু এই ফসলের একটি বৃহৎ অংশ নদী ভাঙন, খরাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দূর্যোগে নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া এখানকার নিম্নআয়ের বেশির ভাগ মানুষ সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া ধরে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। তবে দূর্যোগে এলাকায় যে পরিমাণে ক্ষতি হয় তা পুষিয়ে ওঠা এ অঞ্চলের মানুষের পক্ষে অসম্ভব। দূর্যোগ নিয়ে কাজ করা সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন এনজিও এবং সংস্থার সুযোগ সুবিধা পায় খুবই কম পরিবার। তাছাড়া ইউনিয়ন পরিষদে যে বাজেট আসে তা খুবই সামান্য। এ বাজেট দিয়ে এখানকার মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করা অসম্ভব বলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ।

এলাকাবাসী জানান, ভৌগলিক অবস্থানের কারণে পৃথক তিনটি দ্বীপের সমন্বয়ে বঙ্গোপসাগর তথা সুন্দরবন উপকূলীয় এই উপজেলা একটি পৌরসভা ও নয়টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। এখানে প্রায় সারা বছর ধরে চলে ভয়াবহ নদী ভাঙন, ঘূর্ণিঝড়সহ ছোট-বড় নানা প্রাকৃতিক দূর্যোগ।

আর স্থানীয় বাসিন্দারা প্রতিনিয়ত এসব দূর্যোগের কবলে পড়ে তাদের সহায় সম্পত্তি হারিয়ে দিন দিন নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। অনেকে সর্বস্ব হারিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশে চলেও গেছেন। এখনও পর্যন্ত অপ্রতিরোধ্য ভাঙনের কারণে ছোট্ট হয়ে আসছে জনবসতির মানচিত্র। আবার গ্রীষ্মের শুরু থেকে বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সংকট লেগে থাকে। ফলে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দূর্যোগের সাথে লড়াই করেই এ অঞ্চলের মানুষের বেঁচে থাকতে হয়।

কালাবগি এলাকার জেলে ছালাম মোল্যা বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় আইলায় সহায় সম্পত্তি যা ছিলো সব শেষ হয়ে গেছে। এখন পরিবার-পরিজন নিয়ে রাস্তার উপর ঝুপড়ি ঘরে বাস করি। আর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সুন্দরবনে মাছ-কাঁকড়া ধরে জীবিকা নির্বাহ করি। কিন্তু কাঁকড়া ও মাছের প্রজনন মৌসুমে বনে মোট পাঁচ মাস পাশ, পারমিট বন্ধ থাকে। এ সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে যে চাল দেয় তা দিয়ে সংসার চলে না। ফলে পরিবার-পরিজন নিয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে খুবই কষ্টে দিন কাটে।

তিনি বলেন, ‘এ অঞ্চলের মানুষের প্রধান আমন ফসলও বিভিন্ন প্রাকৃতিক দূর্যোগে নষ্ট হয়ে যায়। তাছাড়া এনজিও’র সুযোগ-সুবিধা পায় খুবই কম পরিবার। সরকার সুন্দরবন থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় করলেও উপকূলীয় এলাকার মানুষের উন্নয়নে সরকারের বিশেষ বরাদ্দ তেমন একটা চোখে পড়ে না। অবিলম্বে এ অঞ্চলে বিশেষ করে ক্লাইমেট রেজিলেন্স ও সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করার দাবি জানান ছালাম মোল্যা। তার মতো একাধিক ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ একই অভিমত ব্যক্ত করেন।

সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশন (সিএসও) সদস্য দান কুমারী বলেন, ‘সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসার্চ স্টাডিজ (সিএনআরএস) ইভলভ প্রকল্পের উদ্যোগে আমরা সিএসও এবং কমিউনিটি বেইজ অর্গানাইজেশন (সিবিও) প্রতিনিধিবৃন্দ জনগণসহ স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নে অংশগ্রহণ করে থাকি। কিন্তু আমাদের চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ খুবই অপ্রতুল।

সরকারের উচিৎ আমাদের দুঃখের কথা চিন্তা করে এই এলাকার জন্য বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া। অবিলম্বে এ অঞ্চলে বিশেষ করে ক্লাইমেট রেজিলেন্স ও সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করার দাবি জানান ছালাম মোল্যা। তার মতো একাধিক ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ একই অভিমত ব্যক্ত করেন। সরকারের উচিৎ আমাদের দুঃখের কথা চিন্তা করে এই এলাকার জন্য বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া।

বানিশান্ত ইউপি চেয়ারম্যান সুদেব কুমার রায় বলেন, ‘আমরা স্থানীয় জনগণকে সাথে নিয়ে এখন বার্ষিক পরিকল্পনা ও বাজেট প্রণয়ন করছি। যেখানে জলবায়ু, জেন্ডার ও সামাজিক অন্তর্ভূক্তির বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে আসছি। ফলে বাজেটে বরাদ্দের পরিমাণও বেড়েছে। যদিও কর ও সেবা মেলার মত কার্যক্রমের ফলে ইউপির নিজস্ব আয় বেড়েছে। কিন্তু বাজেট বাস্তবায়নের জন্য তা যথেষ্ট নয়।ফলে সরকারকে সুন্দরবন বেষ্টিত এ এলাকার জন্য বিশেষ বরাদ্দের দাবি জানান তিনি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসমত হোসেন বলেন, সুন্দরবন সংলগ্ন এই উপজেলার মানুষ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে প্রতিনিয়ত লড়াই করে বেঁচে থাকে। এছাড়া দূর্যোগে এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা যেমন- রাস্তাঘাট, ওয়াপদা বেড়িবাঁধসহ প্রধান ফসল আমন ধান প্রতি বছরই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে। পাশাপাশি দূর্যোগের ফলে নারী, বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে।

তাই সকল সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলো তাদের কর্মকাণ্ডে সমাজের এ সমস্ত পিছিয়ে পড়া মানুষদের অগ্রাধিকার বিবেচনায় উপজেলা প্রশাসন কাজ করে যাচ্ছে।