
সিরাজুল ইসলাম খুলনা থেকে:ভূমি ব্যবহার বা মালিকানার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় বা সরকারী পর্যায়ে ১৭৯৩ সালের ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’, ১৮৮৫ সালের ‘বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন’, ১৯৫০ সালের ‘পূবর্বঙ্গ জমিদারী অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের’ ধারাবাহিকতায় ১৯৮৪ সালে ‘ভূমি সংস্কার অধ্যাদেশ’ প্রণীত হয়।
এ অধ্যাদেশ অনুযায়ী ভূমির মালিক ও বর্গাদারের মধ্যে চুক্তি হতে হবে লিখিত, যা অন্তত ৫ বছরের জন্য বলবৎ থাকবে এবং বর্গাদারের সক্ষম উত্তরাধিকারী থাকলে তিনিও বর্গাদারিত্ব পাবেন।
সেখানে উৎপাদিত ফসল তিন ভাগ হবে: এক ভাগ ভূমি মালিক, এক ভাগ বর্গাদার এবং এক ভাগ যে পক্ষ বীজ, সার ও সেচের খরচ বহন করবে সেই পক্ষ পাবে, অর্থাৎ অর্ধশতাব্দিকালের পুরাতন তেভাগা আন্দোলনের দাবী বাস্তবায়িত হয়। এছাড়া বেনামী লেনদেন ও কৃষি প্রজাদের বাস্তুভিটা থেকে উচ্ছেদ বাতিল করা হয় এবং পরিবার বা প্রতিষ্ঠান পিছু কৃষি জমির পরিমাণ সর্বোচ্চ ৬০ বিঘা (১ বিঘা= ৩৩ শতক) নির্ধারণ করা হয়। এছাড়া ১৯৮৯ সালে ‘ঋণ সালিশী আইন’ এবং ২০১৩ সালে ‘জাতীয় কৃষি নীতি’ প্রণীত হয়।
বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের ভূমিস্বত্ব ও ভূমির ব্যবহার এবং কৃষির ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা বিদ্যমান সে সম্পর্কে তথ্য অন্বেষণ এই কাজের বিষয়বস্তু ।
এ কাজে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষক এবং ক্ষেতমজুরদের সাথে ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার ও দলীয় আলোচনা, বিভিন্ন সরকারি কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তার সাথে আলোচনা, পাঁচটি এলাকায় জরিপ, সফলতার কাহিনী সংগ্রহ এবং নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক দলের সদস্যদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে।
আমাদের মাঠ অভিজ্ঞতা এবং জরিপ থেকে এটা উঠে এসেছে যে, গ্রামাঞ্চলে এখন বর্গা নেবার তুলনায় ক্যাশ লীজ বা কন্ট্রাক্ট নেবার হার বেশী এবং এটি ক্রমশ: বৃদ্ধি পাচ্ছে। লীজ জনপ্রিয় হচ্ছে কারণ এর ফলে ক্ষুদ্র এবং প্রান্তিক কৃষক স্বল্প পুঁজি বিনিয়োগ করে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ জমির মালিকানা স্বত্ব নিরবিচ্ছিন্নভাবে ভোগ করে।
যা কিনা তার বেঁচে থাকার এবং আত্ম উন্নয়নের মূল দিক। আগে কৃষকের লক্ষ্য থাকত টাকা জমিয়ে জমি কেনার কিন্তু এখন কৃষক জমি কেনার বদলে লীজ নিতে আগ্রহী।
কারণ গ্রামাঞ্চলে পুঁজির অনুপ্রবেশের ফলে জমির দাম গত ১০-১৫ বছরে ক্রমবর্ধমানভাবে অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। যা কৃষকের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
ফলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক ক্রমশ: লীজ ও কন্ট্রাক্ট প্রথার দিকে ঝুঁকছে। লীজ ও কন্ট্রাক্ট নেবার মূল কারণ ভূমিহীনতা, নিজস্ব জমি কম থাকা, টাকা খাটানো, চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ এবং আয় বৃদ্ধি করা।
বিনিময় মূল্যের ক্ষেত্রে পণ্যের বদলে ক্যাশ টাকার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হচ্ছে, যা কিনা দুপক্ষই মনে করছে তারা লাভবান হচ্ছে। এটা গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় যে, একটি পদ্ধতি জমির মালিক এবং চাষী দুপক্ষকেই সন্তষ্ট করছে।
যা আমাদের কাজের মধ্যে দিয়ে বের হয়েছে। জমির মালিক খুশি কারণ বর্গা ব্যবস্থায় ফসলের অর্ধেক ভাগ দিয়ে দিতে হয় বলে বর্গাচাষী জমিতে যথেষ্ট পরিমাণ শ্রম বিনিয়োগ করে না।
দ্বিতীয়ত : জমিতে ফসল বেশি হলেও অনুপস্থিত জমির মালিক হওয়ার কারণে সঠিক উৎপাদনের পরিমাণ জানতে পারে না বলে তারা মনে করে এবং ভাবে যে, একারণে ভাগে কম পাচ্ছে।
অন্যদিকে ফসল নষ্ট হলে পুরোটাই ক্ষতি। তার তুলনায় লীজের মাধ্যমে বাৎসরিক একটি নির্দিষ্ট অর্থ যদি অগ্রিম পাওয়া যায় তা অন্য কোন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করতে পারে, যেমন ব্যবসা বা সঞ্চয়পত্র ক্রয়।
তাদের ধারণা সঞ্চয়পত্র থেকে যে পরিমাণ সুদ তারা পেতে পারে তা বর্গাচাষ হতে প্রাপ্ত ফসল হতে বেশি।
লীজ বা বন্দক প্রক্রিয়াতে গেলে সে অর্থে জমির প্রতি কোন বিনিয়োগ না করেই রিটার্ন পাওয়া যায়, ফলে জমির মালিক সন্তষ্ট। অন্যদিকে কৃষক সন্তুষ্ট কারণ সে জানে অর্থের বিনিময়ে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ জমি তার নিজস্ব মালিকানার অধীন থাকবে একটি নির্দিষ্ট সময়ব্যাপী।
ফলে এই জমিতে সে তার সর্বোচ্চ শ্রম বিনিয়োগ করে সর্বোচ্চ উৎপাদন পেতে পারে। যার ভাগীদার ১০০% সে নিজেই। এই প্রক্রিয়ায় সে উদ্বৃত্ত সৃষ্টি করতে পারে। যে উদ্বৃত্ত তাকে উন্নয়নের দিকে এবং সম্পদ বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। এটি তাকে এক ধরনের নিশ্চয়তা প্রদান করে থাকে।
যদি কোন কারণে কোন একটি ফসল নষ্ট হয় তাহলে পরবর্তী ফসলের মাধ্যমে সে ক্ষতি পুষিয়ে নেবারও একটা ব্যবস্থা থাকে। এই প্রক্রিয়ায় জমির মালিকের প্রতি তার দায়বদ্ধতাও কম থাকে।
অন্যদিকে ফসল কন্ট্রাক্ট পদ্ধতিতে কোন জমি নির্দিষ্ট পরিমাণ ফসলের বিনিময় চুক্তিতে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চাষাবাদ করা যায়। ফসল ওঠার পর জমির মালিক নির্দিষ্ট পরিমাণ ফসল কৃষকের কাছ থেকে জমি ব্যবহার করা বাবদ গ্রহণ করেন।
জমির মালিক চাষাবাদের কোন খরচ বহন করেন না, খরচ ও ঝুকি উভয়ই জমি কন্ট্রাক্ট নেয়া কৃষকের।
এলাকাভিত্তিক অন্যান্য যে বিষয়গুলো উল্লেখ করার মত তা হচ্ছে : নীলফামারী মঙ্গাপ্রবন এলাকা হিসাবে চিহ্নিত, জোতদারের হার কম।
ফলে কৃষকের নিজ জমি চাষের প্রবনতা বেশি। এখানে লীজ গ্রহণকারীর সংখ্যা বেশি। পটুয়াখালী এলাকার কলাপাড়া সমুদ্র তীরবর্তী এলাকা। এলাকায় নোনাজলের প্রভাব বেশি।
এই এলাকায় খায়খালাসী প্রথা বেশি চলে এবং ফসলের বিনিময়ে কন্ট্রাক্ট প্রথা বেশি প্রচলিত। নওগাঁ বরেন্দ্র এলাকা হবার কারণে ভূমি ব্যবহারে কৃষকের নিজস্ব সম্পৃক্ততা বেশি।
বিশেষ করে ধানী জমি আমবাগানে পরিণত করার প্রবনতা বৃদ্ধির কারণে জমি লীজ ও বর্গা দেবার প্রবণতা কম। বগুড়াতে সবজী চাষের প্রাধান্য বেশি, বিশেষ করে সারিয়াকান্দিতে মরিচের চাষ হয় বেশি। যা কিনা হাই ভ্যালু ক্যাশ ক্রপ হিসেবে পরিচিত। দিনাজপুর ধান উৎপাদনের এলাকা।
এখানে সুগন্ধী চাল উৎপাদন হয় ফলে জমি লীজ দেবার এবং নেবার প্রবনতা বেশি। এখানে জোতদারের হাতে থাকা জমির পরিমাণ অনেক বেশি।
সম্পাদক ও প্রকাশক : খন্দকার আছিফুর রহমান তোতা
ঢাকা কার্যালয় : সেক্টর-০৫, রোড-০১, বাড়ি-৩৫ (২য় তলা), উত্তরা, ঢাকা-১২৩০। মোবাইল : ০১৯৪৩-৬৮৩০২৭, ০১৯৪৬-৯৬২৭১৮, ই-মেইল: newsmanobadhikarprotidin@gmail.com, manobadhikarprotidin@gmail.com, ওয়েবসাইট : manobadhikarprotidin.com